কী তুমুল আলোড়নে বারংবার আপনি জেগে উঠেন এই বদ্বীপে!

প্রিয় বঙ্গবন্ধু,
আপনাকে বলিনি, কী তুমুল আলোড়নে বারংবার আপনি জেগে উঠেন এই বদ্বীপে। আপনাকে বলিনি, কী নেশাচ্ছন্ন করে রাখে আপনার কণ্ঠধ্বনি আজো। আপনার পাইপের ছবি, চুলের স্টাইল, পোশাকের অনন্যতায় এখনো কী মুগ্ধ হয়ে থাকি অহর্নিশ।
আমাদের কোন আগামেমনন ছিলো না। ছিলো না একিলিস কিংবা হেক্টর। কতো শত বছরের পরাধীনতায়, আমরা খাঁচার পাখির মতো প্রভুর পোষ মেনে নিয়েছিলাম। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি, আমাদের মগজ থেকে খসে অতলে হারিয়ে গিয়েছিলো। পরাধীনতার আফিম, স্বাধীনতার স্পৃহাকে অবশ করে রেখেছিলো। স্বাধীনতার স্বাদ নেয়ার সাহস ছিলো না আমাদের। শোষণের খাঁচা ভঙ্গার জন্য যে ঐক্যশক্তির স্ফুরণ দরকার, সেটা জাগানোর কেউ ছিলো না। আপনি সে স্ফুরণের জন্য, টেলেমেকাসের মতো ঘর ছাড়লেন। আমাদের জন্য হাঘরে হলেন। অসংখ্য মানুষের মনোনদীকে এক মোহনায় এনে, শপথ করালেন—তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা।

আপনার কণ্ঠে ছিলো হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালার চেয়েও বড়ো বেশি মোহন জাদু। ঘর ছেড়ে, খাবার ছেড়ে, প্রিয়তম স্ত্রীর বাহুবন্ধন ছেড়ে, কোমল জায়নামাজ থেকে উঠে, প্রিয়তমার চুম্বনকে ছুটি দিয়ে, মানুষ আপনার কথা শুনতে ময়দানে এসেছিলো। কী তন্ময় হয়ে ক্লান্তিহীন চোখে তাকিয়ে ছিলো আপনার মুখের দিকে। আপনি তাদের বললেন, ‘এবারে সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’। পরাধীনতার আফিমের ঘোর কেটে গেলো আপনার আওয়াজে। স্বাধীনতার জন্য কী মরিয়া হয়ে উঠলো মানুষ!

আপনার মোহন জাদুতে প্রতিটি ঘর হয়ে উঠলো বাঙ্কার। বাড়ির আঙ্গিনায় আঙ্গিনায় হলো অসংখ্য ট্রেঞ্চ! মহল্লার মাস্তান ছেলেটা হয়ে গেলো গেরিলা। গ্রামের চোর-ডাকাতরা শপথ নিলো যুদ্ধে যাওয়ার। তরুণরা, প্রেয়সীর হাত ছেড়ে দিয়ে নিলো থ্রিনট থ্রি আর মেশিনগান। অবুঝ শিশুগুলো কী অসীম সাহসে, বুকে বোমা বেঁধে, ঝাপিয়ে পড়লো শত্রুর ট্যাংকের নিচে। আপনার মোহন জাদুতে, আমাদের তরুণীরা আঁচল বেঁধে, রাইফেল নিলো কাঁধে।
আপনি মানুষকে মরতে শিখিয়েছিলেন, একটি পতাকার জন্য। ঢাকায় বসে আপনি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন রাওয়ালপিন্ডি, পেশোয়ার আর করাচির তখত্। অসংকোচ চিত্তে আপনি বলেছিলেন, ‘আমি মানুষ, আমি বাঙালি, আমি মুসলমান’। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আমার লাশটা ফিরিয়ে দিও বাঙালীর কাছে’। আপনি ছাড়া কারো সাহস হয়নি, অসংখ্য মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে মিথ্যে প্রমাণ করার। স্বাধীন ভূমিতে প্রত্যাবর্তনের আনন্দে, আপনি শিশুর মতো কেঁদেছিলেন। আপনি বিদেশি সাংবাদিক আর ডেলিগেইটদের পাশে অটল দৃঢ় চিত্তে কথা বলে বুঝিয়ে দিতেন—বাঙালীকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।

এরপর বহুদিন হয়েছে গত! এখনো পূর্ণিমার আলোয় জ্বলজ্বল করে পদ্মার জল। এখনো গোধূলিতে, আকাশ তার পায়ে দেয় প্রগাঢ় লাল আলতার রঙ। এখনো রেইসকোর্স ময়দানে, সবুজ ঘাসে জমে শিশিরের স্ফটিক জল। ফড়িংগুলো কী নিবিড় মমতায়, স্বাধীন চিত্তে সেখানে বুনে তার ঘর। অথচ আপনার সফেদ পাঞ্জাবীর দেখা মেলা না এই শহরের কোথাও। কী ভীষণ অভিমানে, অদৃশ্য হয়েছেন ইথাকার বদ্বীপ থেকে! আপনাকে খুঁজে পাওয়া যায় না আর এই লোকালয়ে।

হে টেলেমেকাস, আমি জানি আপনি আজো ভালো নেই। আপনি জেনে থাকবেন, আপনার কথা বলে বলে ওরা আজ রাষ্ট্রকে লুট করে। আপনার নাম বেচে, কী নিদারুণ অনিয়ম করে বেড়ায় ওরা সমাজে। আপনার আর্দশের নাম ভাঙ্গিয়ে কী নৈরাজ্য করছে ওরা। অপনি কী চেয়েছিলেন, এদেশটা ধর্ষকদের হাতে চলে যাক? আপনি কী চেয়েছিলেন, এদেশটা ঘুষ-দুর্নীতি আর লুটপাটে নুয়ে পড়ুক? আপনি কী চেয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঝিমিয়ে পড়ুক অনিয়ম আর দলীয়করণে? আপনি কী চেয়েছিলেন, মানুষগুলো কাজ না করে শুধু লেজুড়বৃত্তি করে বেঁচে থাকুক? —স্বাধীনতা কী এজন্যই এনেছিলেন? এজন্যই কী পুরো বাংলাদেশ একটা শহীদমিনার হয়ে উঠেছিলো?
এই অকাল, গ্রহনের কালে, আপনার অপেক্ষায় এখনো প্রহর কাটায় মানুষ। সমস্বরে গেয়ে উঠে,

‘তুমি কি এখনো আসবে না? স্বদেশের পূর্ণিমায়
কখনো তোমার মুখ হবে নাকি উদ্ভাসিত, পিতা,
পুনর্বার? কেন আজও শুনি না তোমার পদধ্বনি?
এদিকে প্রাকারে জমে শ্যাওলার মেঘ, আগাছার
দৌরাত্ম্য বাগানে বাড়ে প্রতিদিন। সওয়ারবিহীন
ঘোড়াগুলো আস্তাবলে ভীষণ ঝিমোয়, কুকুরটা
অলিন্দে বেড়ায় শুঁকে কত কী-যে, বলে না কিছুই।
…..
ইথাকায় রাখলে পা দেখতে পাবে রয়েছি দাঁড়িয়ে
দরজা আগলে, পিতা, অধীর তোমারই প্রতীক্ষায়।
এখনো কি ঝঞ্ঝাহত জাহাজের মাস্তুল তোমার
বন্দরে যাবে না দেখা? অস্ত্রাগারে নেবে না আয়ুধ
আবার অভিজ্ঞ হাতে? তুলবে না ধনুকে টঙ্কার’?
(কবিতার অংশটুকু শামসুর রাহমানের ‘টেলেমেকাস’ থেকে উদ্ধৃত)

লেখক: Rauful Alam
ফিলাডেলফিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published.