ইতিহাস, প্রেক্ষাপট ও শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ পুরস্কার

“আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রীস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতির মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহিদদিগকে প্রাণোত্‍সর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ সংবিধানের মূল নীতি হইবে; আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে; আমরা দৃঢ়ভাবে ঘোষনা করিতেছি যে, আমরা যাহাতে স্বাধীন সত্তায় সমৃদ্ধি লাভ করিতে পারি এবং মানবজাতির প্রগতিশীল আশা আকাংখার সহিত সঙ্গতি রক্ষা করিয়া আনত্মর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন করিতে পারি, সে জন্য বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিস্বরূপ এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুন্ন রাখা এবং ইহার রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান আমাদের পবিত্র কর্তব্য;”

আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনার এই অংশটি আমি যতবার পড়ি ততবারই নতুন করে উজ্জীবিত হই, অনুপ্রাণিত হই৷ এর ইতিহাস আমাকে গর্বিত করে তোলে, বুকভরা সাহস দান করে৷ মনের অজান্তেই সেই বীর যোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতায়, আমার চিত্ত নত হয় বিনম্র শ্রদ্ধায়৷

আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সংগ্রামী জীবনে আচ্ছন্ন হয়ে আবার যখন দেখি- কৃষকেরা আট থেকে দশ হাজার টাকার ফসল উত্‍পাদন করতে মাসের পর মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, তার সাথে তাঁরা বিভিন্ন ধরণের শঙ্কায় জর্জরিত হন৷ তারপরেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘাম ঝরান, রোদ-বৃষ্টি গায়ে নিয়ে সংসারের সব দুঃখ-কষ্ট দুর করতে স্বপ্ন দেখেন৷ গার্মেন্টস শ্রমিকেরা পাঁচ থেকে আট হাজার টাকার জন্য পুরো মাস জুড়ে এক মনোযোগে সাধনা করেন৷ অনেক সময় সেই ন্যায্য পাওনাটাও সংগ্রাম-অনশনের মাধ্যমে আদায় করে নিতে হয়৷ অনেকের এই সংগ্রামী জীবন কংক্রিটের চার দেওয়ালেই হঠাত্‍ আটকে যায়, হয়ত চাপা খেয়ে নয়ত পুড়ে ছাঁই হয়ে৷ ভিটে-বাড়ি বিক্রি করে প্রবাসে থাকেন যে শ্রমিকেরা, তাঁরা অমানবিক পরিশ্রমের যন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করে দেশে রেমিটেন্স পাঠান৷ কখনো কখনো তাঁরা তাঁদের সংসারের সকল আশা-আকংখার সমাপ্তি ঘটিয়ে সাদা কাপড়ে মোড়ানো, পাহাড় সমান কষ্টের বোঝা হয়ে দেশে ফেরেন৷ তার পরেও কৃষকেরা, গার্মেন্টস শ্রমিকেরা, প্রবাস শ্রমিকেরা সহ সকল স্তরের সাধারণ জনগণ তাঁদের মেধা, শ্রম এমনকি জীবন দিয়েও আমাদের অঙ্গীকারকে সবসময় সমুন্নত রেখে শান্তিময় স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্নকে উজ্জীবিত রাখেন এই চিত্র দেখে, আবারও আমি উজ্জীবিত হই, অনুপ্রাণিত হই৷ বুক ভরা সাহস পাই৷ আমি গর্বিত হই৷ শ্রদ্ধায় আমার মস্তক অবনত করি৷

অন্যদিকে যখন দেখি আমাদের অধিকাংশ রাজনীতিবিদরা নির্বাচনের পূর্বমূহুর্তে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুন্দর সুন্দর কথা বলেন৷ সবাই নিজের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়ে, অন্যদের অদক্ষ ও অসত্‍ প্রমাণ করে আমাদের সমর্থন লাভে সফল হন৷ আমাদের রাজনীতিবিদরা স্বপ্নবাজ৷ আমরা তাঁদের চোখে বড় বড় স্বপ্ন দেখি- আমাদের জীবন, এলাকা ও দেশ নিয়ে৷ এটা করে দেবে, ওটা করে দেবে৷ এই সুযোগ-ঐ সুযোগ আরো কত কি! কিন্তু যখনই তাঁরা ক্ষমতায় অধিষ্টিত হন তখন আমাদের কথা, এলাকার কথা, দেশের কথা সব যেন ভুলেই যান৷ কৃষকের হাত তখন নোংরা হাতে পরিণত হয়৷ শ্রমিকের শরীর তখন দুর্গন্ধে ভরে যায়৷ আর তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পৌরাণিক কাহিনীতে পরিণত হয়৷ তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পরেন সম্পদের পাহাড় গড়তে৷ সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গায় সরকারী-বেসরকারী ভূমি দখল থেকে শুরু করে স্বজনপ্রীতি, টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজি, চাকুরী বাণিজ্য এবং বিভিন্ন ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা ও পৃষ্টপোষক হওয়া ছাড়াও সকল প্রকার আইন বিরোধী কাজে আমাদের রাজনীতিবিদদের বিরাট একটা অংশ সম্পৃক্ত থাকেন৷ এমনকি তাঁদেরই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আশীর্বাদে এক বিশেষ শ্রেণীর মানুষেরা গুম, খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজী, ভূমি দখল, ব্যাংক লুটপাট, শেয়ার বাজার কেলেংকারী সহ সকল প্রকার আইন ও দেশ বিরোধী কাজের অভয়ারণ্য সৃষ্টি করেছে৷ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে এদের মুখোশ উন্মোচিত হচ্ছে৷ আতংকের বিষয় হল তার মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে৷ আমরা কিছুই করতে পারছি না৷ এ ক্ষেত্রে আমরা সাধারণ জনগণ যেন বনশাই গাছের মতই, চার দেওয়ালের মাঝে অগোছালোভাবে আবদ্ধ পূর্ণাঙ্গ মানুষ৷ আমাদের চেতনা আছে, স্বপ্ন আছে, সৃজনশীলতা আছে, কর্মোদ্যোগ আছে কিন্তু তা নির্দিষ্ট গন্ডির ভেতরে৷ সেই গন্ডি কেউ কেউ ভেদ করতে পারলেও তার সংখ্যা খুবই কম৷ এই চিত্র দেখে এবার আমি শুধু ব্যথিতই হইনা, চরমভাবে লজ্জিতও হই৷ আমার বুঝতেও সমস্যা হয় না; এর ব্যাপ্তি শুধু আমাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না সারা বাংলাদেশে ছেয়ে যায়৷

দেশকে সামনে রেখে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই নিজস্ব ভিশন ও মিশন থাকে৷ যা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোরও আছে৷ কিন্তু অধিকাংশের কথা-বার্তা, কাজ-কর্ম দেখলে মনে হয় তাঁদের প্রধান ভিশন ও মিশন হচ্ছে অন্যদলকে যে কোন উপায়ে বিপদে ফেলা৷ সেটা করতে গিয়েও তাঁদেরকে গঠনমূলক কাজ করতে দেখা যায় না৷ আমাদের রাজনীতিবিদরা চিন্তা করেন ঠিকই কিন্তু সেটা গণমুখী নয়৷ তাঁদের চিন্তা দলমুখী আর বর্তমানে প্রায় তার সবটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিকে এসে ঠেকেছে৷ আর তাঁদের প্রধান কাজ হচ্ছে অন্যের দোষ খোঁজা, কুত্‍সা রটানো ও মিথ্যাচার করা৷ নিজেদের কোন দোষ-ত্রুটি নেই এটা প্রতিষ্ঠা করতে রাতদিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন৷ এভাবেই গণমুখী না হয়ে, সরকারী দলে যারা থাকেন তারা বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করতে পারলেই বুঝি ক্ষান্ত হন৷ অপরদিকে বিরোধীদলের ধ্যান-ধারণা এবং সকল কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয় টেনে হিচড়ে সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারলেই যেন সব কিছুর সমাধান হবে৷ সবারই মূল উদ্দেশ্য ক্ষমতা৷ আর তাঁদের ক্ষমতার উদ্দেশ্য যে কি আমরা দেশের সাধারণ জনগণ তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি৷ রাজনীতিবিদদের এরকম জনবিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলেই কিছু অসত্‍ মানুষ আজ চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী, সাম্প্রদায়িকতা, ভূমি দখল, গুম খুন সহ সকল প্রকার অপকর্মের রাজত্ব কায়েম করছে৷ এই জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতিই আমাদের ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও যুবসমাজ সহ প্রায় সর্বস্তরের মানুষকে মুখোমুখি দাড় করেছে৷ আমরা ঝগড়া-মারামারি করছি, যার ফলে আমাদের সমস্যা গুলো নতুন জীবন লাভ করছে, বংশ বৃদ্ধি করছে, অপরদিকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অকারণেই বার বার অগনিত তাজা প্রাণ ঝরে পড়ছে৷ তবে ক্ষমতাই থাকা রাজনীতিবিদদের আয়েশী ও রাজকীয় জীবন নিশ্চিত করার জন্য সুন্দর সুন্দর ব্যবস্থার উন্নয়ন চোখে পড়ার মতই। এই বিষয়ে নিশ্চয় কেউ দ্বিমত পোষন করবে না, এমনকি নির্যাতিত ক্ষমতাবিহীন রাজনৈতিক নেতারাও, কারন তাঁরা সব সময় নিশ্চিত থাকেন এই সুন্দর ব্যবস্তার সবটাই একদিন তাঁদের হবে৷

স্বাধীনতা, রাজনীতি, গণতন্ত্র ও দেশের নামে আমাদের রাজনীতিবিদরা যে সুন্দর সুন্দর কথাগুলো শুনান তা যদি তাঁদের মুখের কথাই না হত তাহলে আজ আমাদেরকে সহিংস রাজনীতির শিকার হয়ে পেট্রোল বোমার আগুনে ঝলসে মরতে হত না৷ রাস্তা থেকে গুম হতে হত না৷ সীমান্তে গুলি খেয়ে পাখির মত মরতে হতনা৷ বিদেশী টিভি চ্যানেলের অবাধ সম্প্রচার নিশ্চিত করে দেশীয় মিডিয়ার হাত-পা বাঁধা হত না৷ আর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টিভি চ্যানেল বিভিন্ন সময়ে সরকারের গোলাম না হয়ে সকল রাজনৈতিক দলের কথা, দেশের সব শ্রেনীর মানুষের সুখ-দুঃখের কথা বলতো৷ দেশের কোটি কোটি টাকা খরচ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচিত করেও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে বাধ্য করা হত না৷ আন্দোলনের নামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হত না৷ নষ্ট হত না আমাদেরকে অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হাজার হাজার গাছ৷ তাদের অঙ্গীকারগুলো যদি নিজেদেরকেই ভাবিয়ে তুলতে পারত-তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরণের প্রাণঘাতি অস্ত্র দিয়ে সিনেমার স্টাইলে সংঘাতে জড়াত না৷ আতিলে তিলে গড়ে তোলা বাবা-মার স্বপ্ন, দেশের স্বপ্নগুলো অকালেই ঝড়ে পড়ত না৷ বিশ্বের অন্যতম সেরা বসবাস অযোগ্য শহর গড়ার লজ্জা পেতাম না৷ দূর্নীতিতে পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ান হতাম না৷ তার সাথে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা বইতে হত না৷ দেশ-বিদেশে দেশের সাধারণ জনগণকে বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার হতে হত না৷ আমাদেরকে দেওয়া প্রতিশ্রতিগুলো রাজনীতিবিদরা কখনই রক্ষা করার চেষ্ঠা করেন নি৷ দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সহ সকল প্রকার সরকারী প্রতিষ্ঠান গুলোকে দলীয়করণ করার মাধ্যমে পঙ্গু করে ফেলেছেন৷ যার ফলে আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচারের সকল পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে৷ আর দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিশীলতা, সাম্প্রদায়িকতা, নারী নির্যাতন, নির্বাচনে কারচুপি, ভোট প্রদানে বাঁধা দেওয়া, বিদেশে টাকা পাচার, বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, সর্বত্র ভেজাল পণ্যের সহজলভ্যতা, অসুস্থ ও অসামাজিক বিনোদনে ভরপুর বিদেশী মিডিয়ার অবাধ বিচরণ, এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বস্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বেচ্ছাচারিতা, রাজনৈতিক দলাদলি, শিক্ষা বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের মত ঘটনাগুলো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে৷ এমনকি সাধারণ জনগণের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ক্ষমতা ভোট প্রদানের অধিকারটাও হরণ করা হচ্ছে৷ এই বিষয় গুলো আমাদের ধর্মীয় গাম্ভীর্য, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চেতনা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে বিকৃত করছে৷ যার ফলে, আমরা কিছু ভুল ধর্মীয় নেতা, ভুল রাজনৈতিক নেতা, ভুল তারকা ও ভুল মিডিয়ার পিছনে ছুটছি৷ ফলশ্রুতিতে আমাদের বিরাট একটা অংশ সবকিছুতেই বিদেশপ্রীতি ও দলকানা মনোভাব পোষণ করছে এবং অনৈতিক, অসত্‍ ও অশানত্মির পথ বেছে নিচ্ছে, অনেকেই রাজনীতিতে উদাসীন হয়ে পড়ছে৷

আমরা যে রাজনীতিবিদদের দেশ পরিচালনায় বারবার মনোনীত করছি তাঁরা শপথ নিয়ে দায় সারার মত কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখিয়ে আমাদের সাথে প্রতারণা করছেন৷ তাঁদের জন্যই আমাদের দেশের পুরো সিস্টেমটাই পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে৷ কিছু সত্‍ ও নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিবিদ থাকলেও বিভিন্ন কারণে তাঁরা উপেক্ষিত হচ্ছেন এবং সব ধরনের দূর্নীতিতে ও অন্যায়মূলক কর্মকর্তা নিশ্চুপ থাকতে বাধ্য হচ্ছেন৷ এটাই হল আমাদের বাস্তবতা আর এভাবেই চলছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ৷ এই অবস্থার কি অবসান হবে? যদি না হয়! তাহলে আমরা যে সম্ভাবনার কথা বলি সেটা রানা প্লাজার মতই একদিন হঠাত্‍ করে ধসে পড়বে৷ আর আমাদের সম্ভাবনা তখন মরীচিকা হয়েই থাকবে৷ আমরা কি এভাবেই চলব? না, অবশ্যই না৷ যে দেশে জয়নাল আবেদীনের মত মানুষ আছেন, যিনি রিক্সা চালিয়ে হাসপাতাল নির্মাণ করতে পারেন৷ যে দেশে মোহাম্মদ রফিকের মত ক্রিকেটার আছেন, যিনি স্কুল স্থাপনের লক্ষ্যে পুরস্কার হিসাবে পাওয়া দামী প্লট ও গাড়ী দান করে দিতে পারেন৷ যে দেশে ভূমিহীন, নিরক্ষর কৃষক বাবা-মা তাঁদের সন্তানকে অনার্স-মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াতে পারেন৷ যে দেশের ১৯৫২ ও ১৯৭১ সালের চেতনা আছে, বিশ্ব বিজয়ের গৌরব আছে৷ এছাড়াও আমাদের অনেক অর্জন আছে যা সারা বিশ্বেই সমাদ্রিত৷ সে দেশকে তো কোনভাবেই দমিয়ে রাখা যাবে না৷ তবে সেই অর্জনগুলোকে আরো মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং নতুন নতুন অর্জন যুক্ত করতে প্রথমেই আমাদের রাজনীতিবিদদের সত্‍ হতে হবে৷ দেশ ও জনগণের জন্য নিবেদিত প্রাণ হতে হবে৷ সৃজনশীল হতে হবে৷ স্বজনপ্রীতি পরিহার করতে হবে৷ ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে, মানুষের হৃদয়ের ভাষা বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে৷

তবে অসুস্থ রাজনীতির পথ ছেড়ে আদর্শ রাজনীতিতে ফিরে আসাটা খুব সহজ কোন বিষয় নয়৷ এই উদ্দেশ্যে আমরা আমাদের মেধা, শ্রম, সময় ও অনেক অর্থ ব্যয় করেছি৷ এখনও করছি৷ কিন্তু আমরা সেই অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌছাতে তো পারিই নি, অকেটাই পিছিয়ে পড়েছি৷ তাই সেই লক্ষ্যে পৌছাতে আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে হবে৷ বর্তমান কাজগুলোর পাশাপাশি নতুন একটা অবলম্বন বা পথ বেছে নিতে হবে৷ যে পথে রাজনীতিবিদরা চেষ্টা করবেন আর আমরা সবাই মিলে তাদের সহযোগিতা করব৷ ফলে তাদের আদর্শ স্বার্থগুলো পূর্ণতা পাবে আর আমরাও আমাদের বর্তমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাব৷ সেক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ পুরস্কার আমাদের সকল সমস্যা সমাধনে বিশাল দ্বার খুলে দিবে৷ বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ সর্ব রোগের মহা ঔষধ হিসেবে কাজ করবে৷ তাই আমি স্বপ্ন দেখি- সামনের দিনগুলোতে আমাদের রাজনীতিবিদরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বনে সকল সাধারণ জনগণকে তাঁদের কাঙ্খিত সেবা প্রদান করে, স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যাবেন এরং অসুস্থ রাজনীতি, শুধু ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের রাজনীতির ধারক ও বাহক হওয়ার কলঙ্ক মুছতে সৰম হবেন৷ রাজনীতিবিদরাই আমাদেরকে শেখাবেন এই দেশকে কিভাবে ভালোবাসতে হবে৷ আর তখনই রাজনীতিতে সুন্দরের প্রতিযোগিতা হবে৷ আমাদের রাজনীতিবিদরা আমাদের জন্য এবং সারা বিশ্বের জন্য আদর্শের প্রতিমূর্তি হবেন ৷ তবেই ত্রিশ লক্ষ শহিদের ও ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণ হবে৷ সর্বপ্রকার হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সরকার দলীয় ও বিরোধিদলীয় সকল রাজনীতিবিদরা আমাদের জাতীয় বিষয়গুলোতে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করবেন৷ প্রতিটি পরিবার সচ্ছল হবে৷ আমাদের যুব সমাজ আধুনিক চিন্তা-চেতনায় ও ভালো কাজে সারা বিশ্বের বিষ্ময় হবে৷ সেই সময় সন্নিকটে৷ আর এজন্য শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ পুরস্কার খুবই গুরম্নত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব পালন করবে৷

আমরা যদি লক্ষ্য করি একটি বিষয় সহজেই স্পষ্ট হয়, সেটা হল- প্রতিটি নির্বাচনেই দেশের সাধারণ মানুষ বেশ কিছু সত্‍ ও নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিবিদদের নির্বাচিত করেন৷ কিন্তু তারা সত্‍ ও নিবেদিত প্রাণ হওয়া সত্ত্বেও সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের অভাবে তাঁদের সত্‍ ইচ্ছা ও সুন্দর স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে পারেন না৷ অন্যদিকে এটাও ঘটে যে, দেশের সাধারণ জনগণের পক্ষে রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে সত্‍-অসত্‍, দক্ষ-অদক্ষ খুঁজে বের করা অসম্ভব হয়ে পড়ে৷ সেক্ষেত্রে এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হবে সত্‍ ও নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিবিদদের জন্য সুস্থ ও সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করা৷ অপরদিকে সাধারণ জনগণকে সত্‍ ও নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিবিদদের চিনতে সহায়তা করা৷ এছাড়াও আমরা দেখি যে, অনেক রাজনৈতিক নেতার অতীত জীবন সত্‍, গণমূখী ও ত্যাগের হলেও বর্তমানে তা প্রশ্নবিদ্ধ৷ তাই এই আয়োজন দেশ ও জাতি গঠনে রাজনৈতিক নেতাদের বর্তমান ভূমিকাকেই মূল্যায়ন করার চেষ্ঠা করবে৷ এভাবেই আমাদের গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা গুলোও কমতে শুরু করবে৷
ফলে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিশাল পথ উন্মোচিত হবে৷ এদিকে দূর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কমতে শুরু করবে৷ রাজনৈতিক নেতারা সবার সামনে অবস্থান নিয়ে যুগোপযোগী সঠিক সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব দিয়ে দেশের সকল মানুষের ধর্মীয় জীবন,আধুনিক শিৰা-সাহিত্য, জ্ঞান- বিজ্ঞান , বাণিজ্য, অর্থনীতি, ক্রীড়া, সংস্কৃতি- ঐতিহ্যসহ সবকিছুকে ঈর্ষণীয় উচ্চতায় নিয়ে যাবেন৷ আর আমরা দেশের আপামর জনগণ রাজনীতিবিদদের আদর্শ নেতা হিসেবে অনুসরণ করা সহ প্রকৃতপক্ষেই ভালোবাসতে শুরু করব৷ এভাবেই রাজনৈতিক নেতাদের ভালো কাজ দেখে দেখে দেশের সকল জনগণ জনজ্ঞানে পরিণত হব৷ সবাই সার্বজনীন চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মখোমুখি না দাড়িয়ে পাশাপাশি দাঁড়াব আর শান্তিময় স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করব৷ তখনই আমাদের প্রিয় দেশটি সারা বিশ্বের কাছে মাথা তুলে দাঁড়াবে, সবার অনুকরণীয় হবে৷

আমি বিশ্বাস করি অদূর ভবিষ্যতে আমরা সবাই ধনী-গরীব, জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে, অহংকার ও বিদ্বেষ ভুলে নতুন এক বিষ্ময় রচনা করব, আর তা হল আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ৷ আর সে লক্ষ্যে শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ পুরস্কার গুরত্বত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার উদাহরণ সৃষ্টি করবে৷

(বিশেষ দ্রষ্টাব্য: নিবন্ধ রচনার সন ২০১৪)

রিপন কিসকু নমেড

উদ্যোক্তা

শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ পুরস্কার

Leave a Reply

Your email address will not be published.